Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ভালো থেকো | চিঠি | Revive Nation | সুব্রত কুমার মোহন্ত

 



অনেকদিন ধরেই ভাবছি, একটা দীর্ঘ চিঠি লিখব তোমার কাছে কিন্তু তুমিটা কে? আমি ঠিক জানি না। খামে প্রাপকের ঠিকানা না লিখে শুধুশুধু ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ে এসে কী লাভ? এজন্য চিঠিটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করছি, যদি তোমার চোখে পড়ে যায়! 


তুমি কি জানো, আমার চাকরি শেষ হতে আর এক বছর আট মাস বাকি আছে?  এরপর দীর্ঘ অবসর। সেই যে পাঁচ-ছয় বছর বয়সে গ্রাম ছেড়েছি, এখন ঊনষাট। আবারও গ্রামে ফিরে এসেছি গত ফেব্রুয়ারি উনিশ তারিখে। মানুষ বুড়ো হলে ছোটো হয়। আমি ছোটোবেলায় গ্রাম ছাড়া হয়েছিলাম আবার ছোটো হয়ে ফিরে এসেছি। ছোট্ট একটা দুইতলা বাড়িও করেছি। আহামরি তেমনকিছু নয়, দুটো দোচালা টিনের ঘর একসাথে করলে যতটুকু হয় ঠিক ততটুকুই। তুমি তো জানো, সেই ছেলেবেলা থেকেই আমি গাছ খুব ভালোবাসি কিন্তু জায়গা কোথায় পাব? পৈত্রিক ভিটায় বাড়ি করেছি। কপর্দকহীন আমার জায়গা কেনার ক্ষমতা কি আছে? তাই গাছ কিনে কিনে পুরো ছাদ, বারান্দা, ঘর, দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বারো-আট  ফুটের উঠোন জুড়ে সেগুলো লাগিয়ে দিয়েছি। গুনিনি, তবে দুশো-আড়াইশো তো হবেই। সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়ি গিয়ে আমি সেগুলোর যত্ন নিই। প্রতিদিন দুই থেকে তিনবার ছাদে উঠি। ঘেমে-নেয়ে অস্থির হয়ে যাই, বুড়ো হাঁটু ব্যথা করে ভীষণ কিন্তু আমার ক্লান্তি লাগে না বরং একটা অন্যরকম প্রশান্তি খেলে যায় মনের ভেতর। ওরা যে আমাকে শুধু প্রশান্তি দেয় তা কিন্তু নয়, কষ্টও দেয়। অনেক গাছ আমি বাঁচাতে পারিনি শুরুর দিকে। তখন খুব কষ্ট পেতাম। এখন মোটামুটি ওদের ভাষা আমি বুঝে গেছি। মরণের আগে আরও কিছুটা সময় পেলে হয়তো সবটাই বুঝে যাব। গত বছর দুয়েক আগে একটা পারসিয়ান জুঁই কিনেছিলাম। কেনার সময় থেকেই পাতাগুলো কেমন হলুদ ছিল। তবুও কিনেছি, কারণ ওটা খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে আমাকে। ফুল আসেনি আজও, পাতাও সবুজ হয়নি। অনেক চিকিৎসার পর এখন পুরো গাছ সবুজ হতে শুরু করেছে। এবার ফুলও দেবে আশা করছি। চন্দ্রপ্রভাটা বেশ ভালোই ফুল দিলো টানা দুই বছর। কী যে হলো, মারা গেল গাছটা। মারা ঠিক যায়নি, একটু জীবন আছে মনে হলো। আই.সি.ইউ-তে রেখেছি, জানি না বাঁচবে কি-না। কিছু ফল গাছ আছে, ওরা মেঘ ফুঁড়ে আকাশ দেখতে চায়। আমি ওদের সাথে কথা বলি, "তোরা তো অনেক উঁচুতেই আছিস, এত বাড়বাড়ন্ত ভালো নয়।" ডালপালা ছেঁটে ছোটো করে দিই। তবুও যদি কথা না শোনে, তাহলে টব থেকে তুলে অর্ধেকের বেশি শেকড় কেটে বাদ দিয়ে দিই। ওরা থমকে যায়, ছোটো হয়ে যায় ঠিক আমার মতো।


এত কথার মাঝে গুরুত্বপূর্ণ কথাটাই বলা হয়নি। একদম অজপাড়াগাঁয়ে আমার বাড়ি। আমার বাড়ি থেকে সামান্য দূরত্বে মহাশ্মশান। আমার ছাদ থেকে লাশ দাহ করা, সমাধিস্ত করা সবই দেখা যায়। আমি দেখি। এমনিতেই প্রতিদিনই তাকিয়ে থাকি ওদিকটায়। ওটাই তো আমার শেষ ঠিকানা! যদি অপঘাতে মৃত্যু হয়ে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে কোথাও পুঁতে রাখে, সে অন্য ব্যাপার। 


আমার মৃত্যুর দিনে তুমি আসবে? জানবে কি কোরে তাই না? মৃত্যুর পরে এসেই বা কী লাভ সেটাও ভাববার বিষয়। শ্মশানের বুড়ো বটগাছটা আমাকে ডাকে প্রতিনিয়ত আয়, আয়, আয়। আগেই বলেছি,  আমি গাছের ভাষা অনেকটা বুঝি। আমি বলি, 'আমি প্রস্তুত।' ও কি আমার ভাষা বোঝে? বুঝুক আর না বুঝুক ওর সাথে আমার দেখা হবেই হবে। তোমার সাথে দেখা না-ই বা হলো। 


ভালো থেকো সুহৃদ।

'শুভ'

২১.০৭.২০২৬ খ্রি.

Post a Comment

0 Comments